“ছোট্ট Rabindranath Tagore-কে ঘিরে শ্যামের আঁকা খড়ির বৃত্ত কীভাবে তার কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে তুলেছিল— সেই হৃদয়স্পর্শী শৈশবের গল্প পড়ুন সহজ ও সুন্দর বাংলায়।”
জোড়াসাঁকোর বিশাল ঠাকুরবাড়ি তখন দুপুরের নীরবতায় ডুবে আছে। উঠোনের এক কোণে ছোট্ট রবীন্দ্রনাথ চুপচাপ বসে। চারদিকে বড়দের ব্যস্ততা, চাকর-বাকরের আনাগোনা, অথচ তার ছোট্ট মনটা যেন বন্দি হয়ে আছে অদৃশ্য এক খাঁচায়।
সেই সময় বাড়ির এক পুরোনো ভৃত্য, শ্যাম, ছোট্ট রবিকে সামলানোর দায়িত্ব পেয়েছিল। দুষ্টুমি করে এদিক-সেদিক ছুটে বেড়ানো ছেলেটিকে থামাতে সে একদিন মাটিতে সাদা খড়ি দিয়ে গোল করে একটি বৃত্ত আঁকল। তারপর কঠোর গলায় বলল—
— “খোকাবাবু, এই দাগের বাইরে কিন্তু যাওয়া যাবে না। বাইরে গেলেই বিপদ আছে।”
রবীন্দ্রনাথ বিস্মিত চোখে সেই গোল দাগের দিকে তাকিয়ে রইল। শিশুমনের কাছে সেটি আর সাধারণ খড়ির দাগ রইল না; যেন এক জাদুময় সীমারেখা। তার মনে হতে লাগল, এই বৃত্তের বাইরে বুঝি অন্য এক রহস্যময় পৃথিবী লুকিয়ে আছে।
সে চুপচাপ বৃত্তের ভেতর বসে জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখতে লাগল। দূরে তালগাছের মাথা দুলছে, পাখিরা ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে, রাস্তায় ফেরিওয়ালার ডাক ভেসে আসছে। ছোট্ট রবি ভাবতে লাগল— ওই পাখিরা কত স্বাধীন! তারা তো কোনো খড়ির দাগ মানে না। ইচ্ছে হলেই আকাশ পেরিয়ে দূর দেশে চলে যেতে পারে।
হঠাৎ এক ঝলক বাতাস এসে উঠোনের শুকনো পাতা উড়িয়ে দিল। রবির মনে হল, বাতাসও যেন তাকে ডাকছে—
“এসো, বাইরে এসো… এই ছোট্ট গণ্ডির বাইরেও বিশাল পৃথিবী আছে।”
কিন্তু সে বৃত্ত ভাঙল না। বরং চোখ বন্ধ করে কল্পনার ডানায় ভর করে দূর-দূরান্তে ঘুরে বেড়াতে লাগল। কখনো সে নিজেকে নদীর মাঝি ভাবল, কখনো পাহাড়ের পথিক, কখনো আবার আকাশে ওড়া পাখি।
শ্যাম দূর থেকে তাকিয়ে ভাবল, ছেলেটি নিশ্চয় ভয় পেয়ে শান্ত হয়ে বসে আছে। কিন্তু সে জানত না, সেই ছোট্ট বৃত্তের ভেতরেই জন্ম নিচ্ছে এক বিশাল কল্পনার জগৎ।
বহু বছর পরে সেই খোকাবাবুই হলেন — যার কলমে ফুটে উঠল মুক্ত আকাশ, স্বাধীনতার স্বপ্ন আর মানুষের অন্তহীন কল্পনার রঙিন পৃথিবী।
